ইসরায়েলে চিকিৎসকদের বিদেশ পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত তিন বছরে কমপক্ষে ১ হাজার ৩৭০ জন চিকিৎসক এক বছরের অধিক সময়ের জন্য দেশ ত্যাগ করেছেন, যার ফলে দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই তথ্য সামনে এসেছে। অধ্যাপক ইতাই আতার, অধ্যাপক নিটাই বার্গম্যান এবং ডোরন জামির এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন।
গবেষণার ফলাফল বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েল ত্যাগের হার বিগত এক দশকের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের সময়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, গত তিন বছরে চিকিৎসকদের বিদেশ যাত্রার হার ৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অন্তত ৪১৬ জন চিকিৎসক এক বছরের জন্য দেশ ত্যাগ করেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ৫৩০ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্যমতে আরও ৪১৯ জন চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন।
যদিও কিছু চিকিৎসক পরে ইসরায়েলে ফিরে এসেছেন, তবুও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে চিকিৎসকদের নিট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০৯ জনে। অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৫৫ জন চিকিৎসক কমে যাচ্ছেন।
গবেষকদের মতে, এই সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলে চিকিৎসকদের বার্ষিক গড় ঘাটতি ছিল মাত্র ৫৪ জন।
ইসরায়েলি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশ ত্যাগ করা। প্রায় সব ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, তবে শিশু বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিশেষায়িত চিকিৎসকদের প্রায় ৬.২ শতাংশ এক বছরের বেশি সময়ের জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন। এছাড়াও বিদেশগামী চিকিৎসকদের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশ সার্জন, ৪.৭ শতাংশ আইসিইউ বিশেষজ্ঞ এবং ৩.৯ শতাংশ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশ ছাড়ার উচ্চ হার। দেশত্যাগী চিকিৎসকদের মধ্যে অন্তত ১৪ শতাংশই ছিলেন অভিজ্ঞ—অর্থাৎ প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন। এক দশক আগে এই হার অনেক কম ছিল।
বিদেশে যাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ২০ শতাংশের বয়স ৪৫ বছরের বেশি। এর মানে হলো, কেবল তরুণরাই নয়, বরং দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি বড় অংশও দেশ ছাড়ছেন।
তবে এক বছরের জন্য বিদেশে যাওয়া মানেই স্থায়ীভাবে দেশ ত্যাগ করা নয়। অনেক চিকিৎসক উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা বা বিশেষ পেশাগত কাজের জন্য সাময়িকভাবে বিদেশে যান। তাদের কেউ কেউ দেশে ফিরে আসেন, আবার কেউ সেখানে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। গবেষকদের মতে, চিকিৎসকদের এই বহির্গমন কেবল জনশক্তির অভাবই ঘটাচ্ছে না, বরং ইসরায়েলের সামগ্রিক চিকিৎসা সেবার মানকেও নিম্নগামী করতে পারে।
বিশেষ করে, চিকিৎসকদের এই বিদেশমুখী প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে দেশটির ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকরা হাতে-কলমে শিখতে বা সঠিক তত্ত্বাবধান পেতে সমস্যার সম্মুখীন হবেন।
অধ্যাপক ইতাই আতার মন্তব্য করেছেন, “২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েল তার মেধাবী মানুষদের হারাচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, দেশের বহু মানুষ চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষায় আছেন। ফলে প্রায় ১ হাজার ৪শ’ চিকিৎসকের এই অভাব সরাসরি স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব ফেলবে—চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার সময় বাড়বে, সেবার মান কমবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান বিঘ্নিত হবে।
আতার সতর্ক করে বলেন, এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সামগ্রিক সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতার ওপর একটি ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হতে পারে।
৩ বছরে ইসরায়েল ছাড়লেন প্রায় ১,৪০০ চিকিৎসক, বাড়ছে ‘ব্রেইন ড্রেইন’



Leave a Reply