ইরান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক-গোয়েন্দা উপস্থিতি কমানোর কথা নীরবে ভাবছে ওয়াশিংটন: সিএনএন

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার অবসান ঘটলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তি কিছুটা সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মার্কিন সরকারের ভেতর থেকে পাওয়া ছয়টি সূত্র বলছে, সংঘাতের পর এ অঞ্চলে ঠিক কতজন সেনা এবং কী পরিমাণ সামরিক অবকাঠামো রাখা হবে, তা নিয়ে বর্তমানে গোপনে আলাপ-আলোচনা চলছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন নিউজ গত ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই খবর প্রকাশ করে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির বড় একটি রূপান্তর। বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি কমানোর ঘোষণা দিলেও নানা সংকটের কারণে ওয়াশিংটনকে বারবার সেখানে ফিরে আসতে হয়েছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও তার আশেপাশের এলাকায় বিশাল এক সামরিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় বিভিন্ন সামরিক অভিযান, বিমান হামলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এসব স্থাপনা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সঙ্গে চলা লড়াইয়ে সেই পরিকাঠামোর ত্রুটিগুলো বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি এখন ইরানের নিক্ষিপ্ত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী এবং মানুষের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই সংঘাতে ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন মার্কিন সেনা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ভেতরের এই অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে কী ধরনের সামরিক উপস্থিতি মেনে নেবেন, তা আগেই অনুমান করা। অতীতে বিদেশি মাটিতে মার্কিন সেনা রাখার ব্যাপারে ট্রাম্প সবসময়ই অনীহা প্রকাশ করেছেন। তা সত্ত্বেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী হতে পারে, তা এখনো সবার কাছে স্পষ্ট নয়।

এখনো মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং এক ডজনের বেশি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের মতো ভারী সামরিক সরঞ্জামও রয়েছে।

একটি বিশেষ সূত্র জানায়, এ বছরের শুরুর দিকে সংঘাত যখন চরমে পৌঁছায়, তখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেসব সিআইএ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদের আবার নতুন করে ওই অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরও যারা মধ্যপ্রাচ্যে থাকবেন, তাদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এর অংশ হিসেবে কিছু সামরিক ঘাঁটি ভূগর্ভস্থ করার পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে এসব ঘাঁটি সুরক্ষিত রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ অবশ্য বহু দিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সামরিক স্থাপনা মাটির নিচে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবে আসছে। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের লাগাতার হামলায় বর্তমান ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা ধরা পড়ার পর বিষয়টি এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এই ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষার ঘাটতি নিয়ে পূর্বধারণা ছিল কর্তৃপক্ষের। কিন্তু সেগুলোর ঘাটতি পূরণে বরাবরই পর্যাপ্ত গতি দেখায়নি যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সমর বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বছর থেকেই বদলাতে পারে মার্কিন সামরিক কাঠামো। চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কাঠামো পরিবর্তনের জন্য ইতোমধ্যে একাধিক সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

তবে যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় বিমান অভিযান পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর এ বিষয়ে করা প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের কাছে পাঠিয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সেন্ট্রাল কমান্ড কোনো মন্তব্য করেনি। সিআইএও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এর মধ্যেই ওয়াশিংটনের সামনে আবারও ফিরে এসেছে বহু পুরোনো প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কতটা সরে যেতে পারবে?

৯/১১-এর পর ব্যাপকভাবে বেড়েছিল মার্কিন উপস্থিতি

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ছিল। ১৯৯৮ সাল থেকে এ অঞ্চলে প্রায় ২৭ হাজার সক্রিয় মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল, যা আগের কয়েক দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

৯/১১ হামলার পর সেই উপস্থিতি আরও দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রথমে আফগানিস্তানে যুদ্ধ, এরপর ইরাক যুদ্ধ এবং পরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য নতুন নতুন ঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।

২০০৩ সালে, ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল। ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ওঠানামা করলেও কোনো সময়ই প্রায় ১ লাখের নিচে নামেনি।

২০১১ সালে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা করেছিলেন, আফগানিস্তানে ‘যুদ্ধের সময় কমে এসেছে’। তিনি সেখানে বাড়তি মোতায়েন করা হাজার হাজার সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেন। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হতে আরও এক দশক সময় লাগে।

একই বছর, ইরাক থেকেও মার্কিন যুদ্ধ সেনা প্রত্যাহার করেন ওবামা। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উত্থান ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও ইরাকে মার্কিন সেনা পাঠাতে হয়।

২০১১ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাসংখ্যা কমলেও তা দীর্ঘ সময় ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজারের মধ্যে ছিল।

ইরানের হুমকি বরাবরই বড় উদ্বেগ

এই পুরো সময়জুড়েই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল ইরান। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা নিয়ে উদ্বেগ ছিল ওয়াশিংটনের। ইরাকে এসব গোষ্ঠীর হামলায় মার্কিন সেনাদের প্রাণহানিও ঘটেছে।

এখন যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখনও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসানের কোনো সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি ওয়াশিংটন ও তেহরান।

ইরান এখনো মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহেও জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে তেহরান। প্রায় এক মাস পর, দুই পক্ষের মধ্যে, আবারও সরাসরি গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার তথ্যমতে, এই আক্রমণগুলোতে ক্ষতির পরিমাণও বেশ ভারী। একজন বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তা ও একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মী জানিয়েছেন, সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত সিআইএ’র একটি ঘাটি ইরানের হামলায় একেবারে বরবাদ হয়ে গেছে।

ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পেন্টাগন কিছুটা লঘু করে দেখানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বটে, তবে বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল ঠিকই আঘাত হেনেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে যে এসব হামলায় বেশ বড় ধরনের ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

সব ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ নাও করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

সিআইএ এবং মার্কিন স্পেশাল অপারেশন বাহিনীর কিছু সদস্য এখন এমন একটি বিকল্প নিয়েও ভাবছেন যেখানে কোনো স্থায়ী ঘাঁটি না রেখেই ঠিক একই কায়দায় অপারেশন পরিচালনা করা সম্ভব।

এই ভাবনার মূল কথা হলো সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সব যুক্তরাষ্ট্রেই রাখা হবে। দরকার পড়লে নির্দিষ্ট কোনো মিশন সম্পন্ন করার তাগিদে তাদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে এবং কাজ শেষ হওয়া মাত্রই আবার দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

এদিকে, ইরানের হামলায় যেসব মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি হয়তো আর নতুন করে তৈরিই করা হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে নিরাপত্তার প্রশ্নটির পাশাপাশি বিশাল অঙ্কের খরচের দিকটিও এখানে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অবশ্য কোন কোন নির্দিষ্ট স্থাপনা আবার পুনর্নির্মাণ করা হবে, সে ব্যাপারে পেন্টাগন এখনো মুখ খোলেনি বা প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।

চলতি বছরের এপ্রিলে পেন্টাগন জানিয়েছিল যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামো সংস্কারে ঠিক কত টাকা খরচ হতে পারে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনও মেলেনি। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ রূপটি কেমন হবে, তা আগে ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর বাড়ানো হতে পারে প্রতিরক্ষা দায়িত্ব

এই আলোচনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে যে পেন্টাগনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা কমিয়ে আনার পক্ষে সায় দিচ্ছেন।

এর সঙ্গে একটি বড় কৌশলগত পরিকল্পনাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। যেমন ধরুন, মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তার ভার স্থানীয় আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের হাতে আরও বেশি করে তুলে দেওয়া।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র যেমন হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে, ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে এবং নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার হুমকি দিয়ে চলেছে, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলানোর স্বভাবটিও কর্মকর্তাদের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসার’ পুরোনো প্রতিশ্রুতি

১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নিজেদের আগামীর ভূমিকা নিয়ে এক প্রকার দোলাচল বা অনিশ্চয়তার ভেতর কাটাচ্ছিল। তাদের তখনকার প্রধান শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়ন ততদিনে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সন্ত্রাসবাদ ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কিছু দক্ষ অ্যানালিস্ট বা বিশ্লেষক থাকলেও তাদের বহর ছিল বেশ ছোট।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্টিন ক্যাম্পাসের গোয়েন্দা ইতিহাস গবেষক জেফরি রগের তথ্য অনুযায়ী, সেই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে সিআইএ কর্মীর সংখ্যা সম্ভবত কয়েক শ জনের বেশি ছিলো না।

কিন্তু নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেল। সিআইএ তখন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে লোকবল নিয়োগ দেওয়া শুরু করে এবং অস্ত্রধারী তথা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা প্যারামিলিটারি বা আধা-সামরিক কর্মীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। সন্ত্রাসী চক্রকে খুঁজে বের করা এবং সফল অভিযান পরিচালনা করাই তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এটি ছিল সিআইএ’র প্রচলিত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাজের ধরনে এক বিশাল রূপান্তর। আগে যাদের মূল কাজই ছিল বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ তৈরি করে গোপনীয় সব খবর জোগাড় করা।

যদিও পরের দুই দশকে গোয়েন্দা ও সামরিক বাহিনী উভয়ের জন্যই মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে।

দল বা মতাদর্শের কথা না ভেবেই অতীতে বিভিন্ন সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এই অঞ্চল ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। এশিয়া অঞ্চলের দিকে সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তির বড় একটা অংশ সরিয়ে নেওয়ার কথা ভেবেছিল ওবামা প্রশাসন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তানীতিতেও চীনকে আমেরিকার প্রধান শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে এশিয়ার দিকে নজর ঘোরানোর এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা মহলে এক প্রকার হাসির খোরাক হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, আইএসের জন্ম থেকে শুরু করে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে খতম করার মতো ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ওই মধ্যপ্রাচ্যেই টেনে নিয়ে গেছে।

ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে?

সম্প্রতি শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সাবধান করে বলেছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঝাঁঝ বাড়িয়ে দিলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

এর পরিবর্তে ট্রাম্প এখন তেহরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর বিষয়টিতেই বেশি জোর দিচ্ছেন। উদ্দেশ্য একটাই, নানা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপে দেশটির সরকারকে কোণঠাসা করে ফেলা।

অথচ এই কৌশল সফল হতে ঠিক কত দিন লাগবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। বহু বিশেষজ্ঞের মতে, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আরও বেশ কিছুদিন এই অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে এবং সহসা আমেরিকার কাছে মাথা নোয়ানোর পাত্র তারা নয়।

অন্যদিকে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কিছু বড় আকারের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখার কথা ভাবছে বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও যুদ্ধের ফলে ভেঙে পড়া এসব ঘাঁটি আবার আগের মতো গড়তে স্থানীয় দেশগুলো কতখানি অর্থ দিতে রাজি হবে, সেটাই এখন আসল প্রশ্ন।

বিশেষ একটি সূত্রের দাবি, কিছু কিছু ঘাঁটি ঠিক করতেই কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হয়ে যেতে পারে।

তবে খুব দ্রুতই যে মধ্যপ্রাচ্যের আশপাশের দেশের মার্কিন সেনা ও ঘাঁটিগুলো ইরানের আক্রমণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত হচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য।

মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, বাহরাইনে অবস্থিত পঞ্চম নৌবহরের চিরাচরিত ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাসদস্যরা সহসাই পা রাখছেন না।

নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল স্পষ্ট করে বলেছেন, বাহরাইনে সেনা সদস্যদের এখনই ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো চিন্তাভাবনা নেই। তিনি একদম রাখঢাক না রেখেই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।

এ থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মিটে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের পুরনো বিন্যাস আর বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনে ইতিমধ্যে বড় ধরনের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *