হবিগঞ্জের সংরক্ষিত বনভূমি থেকে গাছ পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেখানে বন উজাড়ের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা ও বন বিভাগের কর্মী-কর্মচারীদের যোগসাজশের বিষয়টি উঠে এসেছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বন বিভাগ ৬২ জনের বিরুদ্ধে আলাদা মামলা দায়ের করেছে। তবে মামলার অভিযোগে গোয়েন্দা সংস্থার গুরুতর দাবিগুলো অনেকটাই অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বন্যপ্রাণীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে, এই বন দীর্ঘকাল ধরে গাছ কাটার শিকার হচ্ছে। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও মাধবপুর এলাকার প্রায় ২৪৩ হেক্টর বনাঞ্চল তদারকি করার দায়িত্ব নвня নয়জন কর্মকর্তার।
গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, বন বিভাগের লোকজনের সহায়তায় স্থানীয় বনদস্যুরা গাছ চুরি করে নিয়ে যায়। সেই একই প্রতিবেদনে গাছ চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের ১২ জনের নাম এসেছে। এছাড়া চোরাই কাঠ কেনাবেচার চক্রে আরও আটজনের নাম শনাক্ত করা হয়েছে। গত ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
নির্দেশনার পর ২১ জুলাই অভিযুক্ত বন কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাতছড়ি সংরক্ষিত বন থেকে গত ১৬ মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকার গাছ অবৈধভাবে কাটা ও পাচারের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা। এই বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন জানান, বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর হওয়ায় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা থাকায় পরিস্থিতি বুঝে মামলা করা হয়েছে।
তবে সমস্যা শুধু সাতছড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়; রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সেখানে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৪ জনের নাম এসেছে এবং কাঠ কেনাবেচার চক্রে আরও আটজনের নাম পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশের বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান তা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, বন রক্ষায় রেঞ্জ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ফরেস্ট গার্ডরা দিনরাত ও রাতেও না ঘুমিয়ে কাজ করছেন এবং বন বিভাগের কারও সঙ্গে কোনো অপকর্মের সংশ্লিষ্টতা নেই।
রেমা-কালেঙ্গা এলাকায় গত আড়াই বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার গাছ পাচারের অভিযোগে ৪২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বন বিভাগ। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্তদের ধরা সম্ভব হলেও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। কাঠের প্রকৃত মূল্য কত, তা পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে জানাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে চুনারুঘাট থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং তদন্ত শেষে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে মামলা হওয়ার কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, মামলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবিদরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ সহ-সভাপতি তোফাজ্জল সোহেল মনে করেন, কাউকে আড়াল করতেই হয়তো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে। প্রকৃত ক্ষতি যাচাই না করে এভাবে মামলা করা হয়েছে। একইভাবে সুজনের হবিগঞ্জ সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন মন্তব্য করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা প্রমাণ করে যে তারা এই চক্রের সাথে জড়িত ছিলেন। তাই বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হতে পারে। উল্লেখ্য, সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ বনগুলো যদি এভাবে উজাড় হতে থাকে, তবে দেশের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
দুর্বৃত্তদের নজর সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গায়, সাবাড় হচ্ছে বনাঞ্চল









Leave a Reply