২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলনে স্বামী মো. জসিম উদ্দিন নিহত হওয়ার পর তদন্ত কমিটিকে সাক্ষ্য দেওয়ায় বড় মেয়ে লামিয়া ধর্ষণের শিকার হন বলে ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন নিহত জসিমের স্ত্রী রুমা বেগম। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি জানান, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার কথা জানাজানি হয়ে গেলে মানসিক আঘাত সইতে না পেরে লামিয়া শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার শুনানিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। নিষিদ্ধঘोषित আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে চলা এই বিচারিক কার্যক্রমে তিনি নিজের জবানবন্দি উপস্থাপন করেন।
রুমার পৈতৃক নিবাস পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় এবং পেশায় তিনি একজন গৃহবধূ। গত জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলিতে তার স্বামী জসিম উদ্দিন মারা যান। জীবিকার তাগিদে জসিম একটি প্রতিষ্ঠানে গাড়িচালকের কাজ করতেন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রুমা জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তার স্বামী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। সেই সময় তারা রাজধানীর আদাবর থানার শেখেরটেক ৬ নম্বর সড়কের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। সেদিন পুলিশের ধাওয়া খেয়ে রক্তাক্ত ও আহত অবস্থায় তিনি বাসায় ফেরেন এবং তার গাড়িটি ধানমন্ডির কোনো এক স্থানে নিরাপদে রেখে আসেন। এর পরদিন ১৯ জুলাই জুমার নামাজ পড়ার কথা বলে জসিম বাসা থেকে বের হয়ে যান এবং আর কখনো ফিরে আসেননি।
তিনি আরও জানান, নিখোঁজ স্বামীর মোবাইল ফোনটি সারাক্ষণ বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। ওই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রতিবেশী কোহিনুর বেগম তাদের বাসায় এসে জানান যে তার ছেলে উজ্জল ফোন করে খবর দিয়েছেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে জসিম সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফ্লোরে পড়ে আছেন।
তদন্ত সংস্থাকে রুমা জানান, সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চাচাশ্বশুর সালাম গাজীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তবে পথিমধ্যে পুলিশ তাদের নানাভাবে বাধা দেয়। পরে অনেক কষ্টে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে গিয়ে একটি ট্রলিতে শোয়ানো অবস্থায় স্বামীর ক্ষতবিক্ষত ও রক্তমাখা দেহ দেখতে পান।
নিজের চোখে দেখা সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ওই সময়ও জসিমের সামান্য জ্ঞান ছিল। পুলিশের গুলিতে তার দুটি আঙুল ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং বুকে বিদ্ধ হয়েছিল আরেকটি গুলি। রুমা লক্ষ্য করেন, বুকের একপাশ দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া সেই মারাত্মক জখম দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে। পরিবারের লোকজন ক্ষতস্থানে গজ গুঁজে রক্ত থামানোর চেষ্টা চালালেও রক্তক্ষরণ কিছুতেই বন্ধ হচ্ছিল না।
ঘটনার শেষ পর্যায়ে রুমা উল্লেখ করেন, জুমার নামাজ শেষে সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে যোগ দিতে মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে গিয়েছিলেন জসিম। সেখানে অবস্থানকালে পুলিশ ও ছাত্রলীগের অতর্কিত গুলিবর্ষণে তিনি মারাত্মকভাবে জখম হন বলে ট্রাইব্যুনালের জবানবন্দিতে তিনি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন।
রুমার সঙ্গে হাসপাতালে সাইফুল নামের এক বিক্ষোভকারীর দেখা হয়। তিনি জানান, সাইফুলই তার স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। অপারেশনের জন্য রক্তের দরকার হলে সাইফুলই টাকা দিয়ে দুই ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে দেন।
রুমা জানান, সেদিন হাসপাতালে অনেক গুলিবিদ্ধ মানুষ আসায় চিকিৎসক ও কর্মীরা ভীষণ চাপের মুখে পড়েন। জসিমের জ্ঞান ছিল বলেই তার অপারেশন সবার শেষে হয়। রাত আড়াইটার দিকে অপারেশন শেষে তাকে অবজারভেশন রুমে পাঠানো হয়।
পরের দিন ২০ জুলাই সকাল ১১টার দিকে অবজারভেশন রুমে গিয়ে তিনি দেখেন জসিমের শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। হাতের ব্যান্ডেজ খুলতেই দেখা যায় দুটি আঙুল নেই এবং সেখানে পচন ধরেছে। চিকিৎসকরা জানান, আঙুলগুলো গোড়া থেকেই কেটে ফেলতে হবে। ২১ জুলাই আবার অপারেশন করে তার দুটি আঙুল কেটে ফেলা হয়।
২২ জুলাই জসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে স্থানান্তরের কথা বলেন। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আইসিইউ পাওয়া না যাওয়ায় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে একটি আইসিইউ বেডের বন্দোবস্ত করা হয়। সেখানে তার বুকে আরও একটি অপারেশন করা হয়। রুমার ভাষ্যমতে, ওই অপারেশনের পর জসিমের আর জ্ঞান ফেরেনি। পরে তার জোরাজুরিতেই জসিমকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। ২৯ জুলাই রাত আনুমানিক নয়টার দিকে জসিম মারা যান।
আদালতের জবানবন্দিতে রুমা জানান, পুলিশি ছাড়পত্র ছাড়া মৃতদেহ হস্তান্তর করতে রাজি হয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তিনি বনানী থানায় গেলে তাকে মোহাম্মদপুর থানায় পাঠানো হয়। মোহাম্মদপুর থানায় পৌঁছানোর পর তাকে বলা হয় সেখানে কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি, তাই তাকে বনানী থানায় যেতে হবে। এভাবেই ২৯ জুলাই রাত থেকে ৩০ জুলাই দুপুর পর্যন্ত তাকে দুই থানার মধ্যে বারবার ঘুরতে হয়। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের পরিচালকের কাছে গিয়ে মরদেহ হস্তবান্তর করার আকুতি জানান তিনি। পরিচালক তখন বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় দুটি চিঠি পাঠান বলে রুমা জানান।
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাকে সাফ জানিয়ে দেন যে ওপরের মহলের নির্দেশ ছাড়া ছাড়পত্র দেওয়া অসম্ভব। পরবর্তীতে তিনি বাধ্য হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা না করলে যে মৃতদেহ দেওয়া হবে না, এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তার দাবি।
সব ধরনের আইনি ঝামেলা পেরিয়ে ৩১ জুলাই স্বামীর মৃতদেহ বুঝে পান রুমা। সন্ধ্যায় মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দিয়ে ফজরের আজানের সময় তিনি সেখানে পৌঁছান। তার ভাষ্যমতে, দুমকি থানার পুলিশ ফোন করে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পরপরই তড়িঘড়ি করে দাফন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়। সকাল আটটার দিকে জসিমকে দাফন করা হয়।
জবানবন্দিতে রুমা আরও যোগ করেন, শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দেশত্যাগ করেন বলে তিনি নিজের মেয়ে লামিয়ার মোবাইল ফোনে খবর পান। রাজধানী ঢাকায় ফেরার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, নানা ধরনের পত্রিকা, বিভিন্ন ভিডিও এবং এলাকাবাসীর মাধ্যমে স্বামীর হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য তার সামনে আসে।
তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা, মেয়র তাপস এবং জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ বিভিন্ন মহলের হুকুমে পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী এবং এলাকার রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জসিমকে খুনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির নামও প্রকাশ করেন।
রুমার ভাষ্যমতে, ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপে তিনি নিজের চোখে আসিফ আহমেদ, তারিকুজ্জামান রাজীব, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আহাদ হোসেন সোহাগ ও ফজলে রাব্বীকে অস্ত্র হাতে গুলি চালাতে দেখেছেন। আর সাজ্জাদ হোসেনের হাতে ধারালো চাপাতি দেখা গেছে বলেও তিনি জোর দিয়ে দাবি করেন।
এ পর্যায়ে রুমা জানান যে তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর যাবত শেখেরটেক-মোহাম্মদপুর অঞ্চলে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন এবং জবানবন্দিতে যাদের নাম তিনি বলেছেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে তিনি আগের থেকেই চেনেন।
তদন্ত কর্মকর্তার সামনে বয়ান রেকর্ড করার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে রুমা ঢাকায় আসেন। সেই সফরে তার সঙ্গী ছিলেন ভাই বেলাল মৃধা, মেজো মেয়ে বুশরা এবং ছোট ছেলে জুবায়ের ইসলাম। তবে বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ায় তাকে বাড়িতেই রেখে আসতে হয়েছিল।
রুমা ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের জানান, ১৮ মার্চ লামিয়া তার প্রয়াত বাবার কবর জিয়ারত শেষে বাসায় ফেরার সময় এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। রুমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এসেছিলেন বলেই তার তরুণী মেয়েকে টার্গেট করে এই জঘন্য কাণ্ড ঘটানো হয়।
রুমা কান্নায় ভেঙে পড়ে আরও জানান যে ধর্ষণের এই নৃশংস সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর তার মেয়ে চরম মানসিক আঘাত ও অবসাদে ভুগে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। জবানবন্দি দেওয়ার একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ট্রাইব্যুনালের কাছে তার স্বামী হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেন।



Leave a Reply