রংপুর আদালত চত্বরে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্ধারিত মুচলেকা ও অতিরিক্ত ফি আদায়ের মতো অন্যায্য নিয়ম বাতিলের দাবিতে নতুন আইনজীবীদের সাথে সমিতির সদস্যদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও উত্তপ্ত বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। এই বিশৃঙ্খলার মাঝে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয় এবং তার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সন্ধ্যায় আন্দোলনরত আইনজীবীদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় সমিতি।
গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টা থেকে নতুন আইনজীবীরা ভোটাধিকার বঞ্চিত করার জন্য মুচলেকা প্রদান ও বাড়তি ফি দেওয়ার মতো নিয়মগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। দুপুর ১টার দিকে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন অতিরিক্ত ফি ও মুচলেকা ছাড়াই নতুন আইনজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
তবে বিকেল ৩টার পর সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব যখন নতুন আইনজীবীদের ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন, তখন পুনরায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। নতুন আইনজীবীদের সাথে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরাও যোগ দিয়ে সমিতিকে ‘আওয়ামী দালালমুক্ত’ করার স্লোগান দিতে থাকেন এবং সভাপতির চেম্বার ঘেরাও করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হন। আলোচনার জন্য নতুন আইনজীবী জেবুন্নেসা জেবুর মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হলে, সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য সিধাংশু তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নতুন আইনজীবীরা সিধাংশুকে গণপিটুনি দেন, যার প্রতিবাদে পুরোনো আইনজীবীরা এসে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলেন। পরবর্তীতে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও মিছিল নিয়ে আদালতে প্রবেশ করেন।
শেষ পর্যন্ত সামসুজ্জামান সামুর মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা হয়, যেখানে মুচলেকা ছাড়াই ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ফি দিয়ে নতুন আইনজীবীদের ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে পুনরায় ভর্তি কার্যক্রম শুরু হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সমিতি জানিয়েছে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি চলবে।
আক্রান্ত আইনজীবী জেবুন্নেসা জেবু জানান, সিধাংশু তাকে ধাক্কা দিয়ে এবং পা দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ভোটাধিকার হরণের জন্য মুচলেকা দেওয়া অসম্ভব এবং দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় তারা এই লড়াই করছেন। আন্দোলনরত আইনজীবীরা আরও অভিযোগ করেন যে, সমিতির বর্তমান সভাপতি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে বিরোধী মতের আইনজীবীদের দমন করার চেষ্টা করছেন।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য সচিব শফি কামাল এই অন্যায়ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, নতুন আইনজীবীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার যে ষড়যন্ত্র চলছে, তার বিরুদ্ধেই এই আন্দোলন। তিনি জানান, সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশ সত্ত্বেও সভাপতি ও তার অনুসারীরা ভর্তির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেন।
অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন দাবি করেন, তিনি নিয়ম শিথিল করার নির্দেশ দিলেও সভাপতির সমর্থকদের চাপের মুখে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। তবে সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব এ সংক্রান্ত কোনো ঘটনার বিষয়ে জ্ঞান থাকা নেই বলে দাবি করেছেন। উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু জানান, প্রায় ৮০ শতাংশ আইনজীবী এই অন্যায্য নিয়মের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন এবং তারা বাকি নিয়মগুলো বাতিলের জন্যও আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে বার কাউন্সিল থেকে রংপুর এলাকার ১০৮ জন নতুন আইনজীবী লাইসেন্সপ্রাপ্ত হন।
রংপুরে আদালত চত্বরে আইনজীবীদের মধ্যে মারামারি-হাতাহাতি



Leave a Reply