প্রায় নয় বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন প্রজন্মের রোডস্টার বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, আগামী ১ অক্টোবর এই উচ্চক্ষমতার স্পোর্টসকারটি সবার সামনে আনা হবে।
২০১৭ সালে এই নতুন রোডস্টারের পরিকল্পনা প্রথমবার সামনে আসার পর থেকে নানা কারণে বারবার সময় পেছানো হয়েছে। যে কারণে ১ অক্টোবরের এই আয়োজনকে টেসলার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত এই প্রজেক্টের ভাগ্য নির্ধারণের একটি বড় উপলক্ষ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
টেসলার অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে আগামী ১ অক্টোবরের তারিখ দিয়ে গো ফর লঞ্চ সম্বলিত একটি গ্রাফিক পোস্ট করা হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই তারিখ নিশ্চিত করে ইলন মাস্ক লেখেন, নিউ টেসলা রোডস্টার আনভেইল—১০.০১।
মনে করা হচ্ছে, এই অনুষ্ঠানেই গাড়িটির সবচেয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপটি তুলে ধরবে টেসলা। একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক গাড়ি হিসেবে এই মডেলের মাধ্যমে ব্র্যান্ডটির প্রযুক্তিগত মুন্সিয়ানা ফুটিয়ে তোলা হবে।
টেসলা ২০১৭ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয় প্রজন্মের এই রোডস্টার প্রথমবারের মতো উন্মোচন করেছিল। তখন বলা হয়েছিল যে ২০২০ সাল থেকে গাড়িগুলোর ডেলিভারি দেওয়া শুরু হতে পারে। তবে সেই নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও গাড়িটি এখনো উৎপাদন পর্যায়ে গড়ায়নি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে রোডস্টার তৈরির কাজ এবং বাজারে আসার সময়সীমা পিছিয়ে যায়। মূলত মূলধারার গাড়ির উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এই প্রজেক্টে সময় বেশি নিয়েছে কোম্পানিটি।
সেজন্যই ১ অক্টোবরের এই প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি টেসলার ভক্ত, বিনিয়োগকারী ও গাড়িচালকদের মধ্যে তীব্র কৌতূহল তৈরি করেছে। এর মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হবে যে দীর্ঘদিনের এই পরিকল্পনা এবার বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে রয়েছে কি না।
জানা গেছে, রোডস্টারের সার্বিক নকশায় বড়সড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুরুর দিকে টেসলার মডেল এস প্লেইড প্ল্যাটফর্মের নানা যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা ভাবা হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, একেবারে নতুন ডিজাইনে গাড়িটি সাজাচ্ছে টেসলা। গুঞ্জন রয়েছে যে গাড়িটি শেষ পর্যন্ত একটি কার্বন-ফাইবারের হাইপারকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
এর মানে দাঁড়ায়, কেবল অন্য কোনো টেসলার ঝটপট সংস্করণ হিসেবে রোডস্টার আসছে না। বরং অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক পাওয়ারট্রেন ও উচ্চগতির প্রযুক্তির মিশেলে একে একটি টেকনোলজিক্যাল শোকেস বানাতে চাচ্ছে টেসলা।
এর আগে গাড়িটি নিয়ে বেশ বড়সড় পারফরম্যান্সের দাবি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। যার মধ্যে ছিল চোখ ধাঁধানো অ্যাকসিলারেটর স্পিড এবং ঘণ্টায় ২৫০ মাইলের বেশি টপ স্পিড। তবে চূড়ান্ত উৎপাদনের গাড়িটি শেষ পর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতখানি রাখতে পারে, তা দেখার বিষয়।
আসন্ন এই রোডস্টারের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে স্পেসএক্সের সঙ্গে মিলে তৈরি করা বিশেষ কিছু প্রযুক্তি।
আগস্ট মাসে দ্য ইনফরমেশন প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়েছে, টেসলা রোডস্টারের বিশেষ মডেলে কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার যুক্ত করার কথা ভাবছে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেসএক্সের টেক্সাসের ম্যাকগ্রেগর পরীক্ষাগারে এই নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখানো হতে পারে।
ইলন মাস্ক আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে রোডস্টারের গতি বাড়াতে রকেট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে, যা গাড়িটিকে বাড়তি গতি বা থ্রাস্ট জোগাতে সক্ষম।
তবে একটি কমার্সিয়াল গাড়িতে এ ধরনের প্রযুক্তি কীভাবে বসানো হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। তাছাড়া এই সুবিধা কেবল বিশেষ সংস্করণের গাড়ির জন্যই নির্ধারিত থাকবে নাকি সাধারণ ক্রেতারাও পাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।
এই প্রযুক্তির বাস্তব প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত দেখা গেলে, সাধারণ বৈদ্যুতিক স্পোর্টসকারগুলোর ভিড়ে রোডস্টারকে এক আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যেতে এটি টেসলার দারুণ এক কৌশল হবে।
টেসলার ব্যবসায়িক ভাবনায় এখন বড় ধরনের পালাবদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় গাড়িকেই ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে মানছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষ করে রোবোট্যাক্সি এবং চালকহীন গাড়ির ওপর এখন সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে টেসলা। কিছুদিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিন শহরে সীমিত পরিসরে যাত্রী বহন করা শুরু করেছে দুই সিটের সাইবারক্যাব।
রোডস্টারের সঙ্গে সাইবারক্যাবের গঠন ও লক্ষ্যগত দিক থেকে অনেক ফারাক রয়েছে। এতে কোনো প্যাডেল কিংবা স্টিয়ারিং হুইল রাখা হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে।
ইলন মাস্কের দীর্ঘমেয়াদি ভাবনায় স্বয়ংক্রিয় যাতায়াত ব্যবস্থা টেসলার মূল ব্যবসা হয়ে উঠবে। তার মতে, আগামী দিনে কোম্পানির আয়ের বড় একটি অংশ আসবে এই রোবোট্যাক্সি থেকেই।
অন্যদিকে, রোডস্টারের হাত ধরে হাই-পারফরম্যান্স গাড়ি নির্মাতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও পাকা করতে চাইছে টেসলা। সেই সঙ্গে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির চূড়ান্ত ক্ষমতা তুলে ধরার বড় মঞ্চ হিসেবেও গাড়িটি কাজ করবে।
টেসলার উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রথম রোডস্টার
২০০৮ সালে যখন টেসলার প্রথম রোডস্টার বাজারে আসে, তখন থেকেই এটি কোম্পানির ইতিহাসে এক বিশেষ মাইলফলক হয়ে আছে। লোটাস এলিসের কাঠামোর ওপর তৈরি এই ব্যাটারিচালিত স্পোর্টসকার প্রমাণ করেছিল যে সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ির সঙ্গে গতির লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই বৈদ্যুতিক গাড়ি।
সে যুগে বৈদ্যুতিক যান নিয়ে মানুষের পুরোনো ধারণা পাল্টে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল সেই প্রথম রোডস্টার। বিশ্ব অটোমোবাইল বাজারে টেসলাকে শক্ত ভিত্তিড় ওপর দাঁড় করাতে এই মডেলটি পথ তৈরি করে দিয়েছিল।
প্রায় দুই যুগ পর আধুনিক প্রজন্মের রোডস্টার বাজারে এনে সেই পুরোনো সাফল্যকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার ছক কষছে টেসলা।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ১ অক্টোবরের পর্দা ওঠার পর বহু প্রতীক্ষিত এই গাড়িটি অবশেষে ঠিক কবে নাগাদ সাধারণ রাস্তায় গড়াবে।


Leave a Reply