সরকারের ভেতরে কারা ফ‍্যাসিবাদের সফট পাওয়ারকে স্পেস দিচ্ছে— বাঁধনের ওপর হামলা প্রসঙ্গে ফারুকী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন যে, তিনি যদি একটু খোঁজ নেন, তবে জানতে পারবেন সরকারের ভেতরের কারা আসলে ফ্যাসিবাদের মৃদু শক্তিকে সুযোগ করে দিচ্ছে এবং তাদের শক্তিশালী করছে।

মঙ্গলবার আটই সেপ্টেম্বর সকালে নিজের ফেসবুকের আসল আইডিতে একটি পোস্ট দিয়ে তিনি এই কথাগুলো বলেন।

যমুনা নিউজের পাঠকদের সুবিধার্থে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সেই ফেসবুক পোস্টটি নিচে দেওয়া হলো।

আওয়ামী লীগ দেশে ও বিদেশে এখনো পর্যন্ত কোনো রকম অনুশোচনা ছাড়াই জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, আর এর দায় পুরোপুরি সেই সুশীল সমাজের লোকেদের যারা জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া গণহত্যার রক্তমাখা হাতে থাকা এসব অপরাধীদের পুনর্বাসনের পক্ষে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি করেছিলেন।

এই দায়িত্ব সেই সব ব্যক্তিদেরও, যারা টেলিভিশন চ্যানেলে জুলাই গণহত্যার সমর্থনকারী ও সহানুভূতির প্রকাশকারীদের সুযোগ করে দিয়েছিলেন যেন তারা গণহত্যায় জড়িত দলটিকে অন্যদের সঙ্গে এক পাল্লায় মাপে। এমন সুযোগ তাদের দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা বলতে পারে, তারেক রহমান যদি লন্ডন থেকে রাজনীতি করতে পারেন তবে খুনি হাসিনা কেন ভারত থেকে তা করতে পারবে না? অথচ পরিস্থিতি এমন দাঁড় করানো হয়েছিল যেন মনে হয় তারেক রহমান জুলাই মাসে কোনো গণহত্যা চালিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষকে গুম ও খুন করে জনতার ভয়ে পালিয়ে লন্ডনে গেছেন।

জুলাই আন্দোলনের পক্ষের আমাদের সকলেরই এই দায় রয়েছে, কারণ নিজেদের ক্ষমতার লড়াইয়ে উপরে থাকার জন্য আমরা প্রত্যেকেই এসব বিরক্তিকর বিষয়গুলোকে বিভিন্নভাবে উসকে দিয়েছি। আমাদের অন্তর্বর্তী এবং বিএনপি সরকারের ওপরও এই দায় বর্তায়, কেননা আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধীদের কোনো বিচার বা তিরস্কারের মুখোমুখি করতে পারিনি। ফ্যাসিবাদের প্রধান শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের সম্মতি উৎপাদনকারীদের ভেতরেই। একটি তদন্ত কমিশনের সামনে এনে এদের বিচারের মুখোমুখি না করায় আজ এরা দেশে বসেই ফুঁসে উঠছে এবং বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী জঙ্গিদের মদদ জোগাচ্ছিল।

আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সেই মানুষগুলোরও এই দায় রয়েছে, যারা পুরো জুলাই মাসজুড়ে একদম নীরব ছিলেন, ফ্যাসিস্টদের অপকর্মের বিরুদ্ধে একটি টু শব্দও করেননি, অথচ আগস্টের পনেরো তারিখ আসলে তারা বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন। এর মাধ্যমে তারা মূলত বিদেশে পালিয়ে থাকা জঙ্গিদের এই বার্তাটি পৌঁছে দেয় যে, কোনো ধরনের অপরাধবোধ ছাড়াই তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারো। একটি কথা লিখে রাখতে পারেন, একাত্তরের রাজাকারদের মানুষ যেভাবে ঘৃণা করে, চব্বিশের এই রাজাকারদেরও সাধারণ মানুষ ঠিক একই চোখে দেখবে।

সবশেষে এই দায় আমাদের বিএনপি সরকারের একটি নির্দিষ্ট অংশেরও, যারা সংবাদমাধ্যম কিংবা সংস্কৃতিকে আওয়ামী লীগ ও সিআরআইয়ের হাতে সমর্পণ করেছে এবং এখনো করে চলেছে। বিপ্লবের পরের একটি সরকার চালাবেন সম্পূর্ণ স্বাধীন বৈদেশিক নীতির ওপর ভিত্তি করে, আর অন্যদিকে আপনার গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল পরিচালিত হবে বাকশাল ও সিআরআইয়ের মাধ্যমে, এটি আসলে একটি অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটু সময় নিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার আপনার প্রশাসনের ভেতরে থেকে কারা ফ্যাসিবাদের নরম শক্তিকে জায়গা করে দিচ্ছে এবং তাদের শক্তি জোগাচ্ছে। আপনার মন্ত্রিসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কি মোটেও জানেন না কালচারাল লীগ ও মিডিয়া লীগের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কী নিয়ে আলোচনা চলে? সেখানে কী ধরনের পরিকল্পনা তৈরি হয় এবং তা কীভাবে সংবাদমাধ্যমে অপপ্রচার হিসেবে রূপ নেয়? কোন সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকে এসব প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তা কি তারা বোঝেন? জেনেশুনেই কি তবে তারা এসব চক্রকে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন?

যাঁরা এসব কাজ করছেন, তাঁরা হয়তো ভুলে গেছেন যে জুলাইয়ের অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ ক্ষমতার পালাবদল ছিল না যে সবাই মিলে আবার আগের মতো মিলেমিশে চলা যাবে। তাঁরা যেন ভুলে না যান, জুলাই মাসে রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ঘটেছে এবং তার আগের ষোলো বছর ধরে গুম ও খুনের রাজত্ব কায়েমের পাশাপাশি দেশটাকে কার্যত অন্য কোনো রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা এ কথাও মাথায় রাখছেন না যে বাকশালের সমর্থকেরা যেকোনো মুহূর্তে সুযোগ নেওয়ার অপেক্ষায় ওৎ পেতে বসে আছে। মনে রাখা ভালো, অন্তরে বাকশাল ধারণকারীদের প্রধান ও একমাত্র শত্রু কিন্তু বিএনপিই।

আপনাকে বলছি না যে কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথে হাঁটতে হবে। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঠিক বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের অন্তত তিরস্কারের আওতায় আনা দরকার। অন্তত এটুকু তো করা যায় যেন তাদের কোনোভাবেই প্রশ্রয় বা গৌরবান্বিত করা না হয়।

লেখাটির শেষ পর্যায়ে গিয়ে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে ট্যাগ করে ফারুকী লিখে দেন যে তিনি যেন কোনোভাবেই ভেঙে না পড়েন।

এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ইতালির মাটিতে হেনস্তার মুখে পড়েন এবং পরবর্তীতে হামলার শিকার হন বাঁধন। বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, রাতের বেলা ইতালির রাজপথে কয়েকজন প্রবাসী বাঙালি যুবক হঠাৎ করেই তাঁর ওপর চড়াও হয়েছেন। তাঁর দিকে পানি ও কোমল পানীয়ের বোতল ছুড়ে মারা হয় এবং তাঁদের মধ্যে একজন তাঁকে মারতেও তেড়ে যান।

এই অপ্রীতিকর ঘটনার পরপরই বাঁধন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি লাইভ ভিডিওতে আসেন। সেখানে তিনি জানান যে ভেনিসে নিজের ভাইয়ের পরিবারের লোকজনকে নিয়ে তিনি একটি পার্কে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রবাসী কিছু বাঙালি সেখানে এসে তাঁকে নানাভাবে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন।

তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, আক্রমণকারীরা গায়ে হাত তোলার পাশাপাশি তাঁর মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দেন এবং কানের ঠিক পাশেই আঘাত করেন। সে সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর ভাইয়ের ছোট্ট শিশুটি মারাত্মকভাবে ভয় পেয়ে অঝোরে চিৎকার করতে থাকে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাঁধনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই মূলত ভেনিস আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পদধারী বা সমর্থক পরিচয় দেওয়া কিছু কর্মী এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *