জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসক্যাপ) অধীনস্থ আঞ্চলিক সংস্থা ‘এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক ট্রেনিং সেন্টার ফর ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্ট’ (এপিসিআইসিটি)-এর গভর্নিং কাউন্সিলের সভাপতিত্বের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ।
গত ৩ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অবস্থিত জাতিসংঘ সম্মেলন কেন্দ্রে গভর্নিং কাউন্সিলের ২১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন চেয়ার নির্বাচিত হন। তিনি বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং এসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল রূপান্তর, জনসেবায় নতুনত্ব আনা এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিবেচনা করে এই নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই নতুন দায়িত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আদান-প্রদান, কারিগরি সহায়তা এবং আঞ্চলিক মেলবন্ধন দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০২৫ থেকে ২০২৮ মেয়াদের জন্য এপিসিআইসিটি গভর্নিং কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ মনোনীত হয়েছে। কাউন্সিলের অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, ভারত, কাজাখস্তান, ফিলিপাইন, রাশিয়া, থাইল্যান্ড ও উজবেকিস্তান। দক্ষিণ কোরিয়াসহ মোট নয়টি দেশ এই কাউন্সিলে অংশগ্রহণ করছে। এপিসিআইসিটির নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচিত চেয়ার পরবর্তী নিয়মিত অধিবেশন পর্যন্ত এই পদের দায়িত্ব পালন করবেন।
২১তম অধিবেশনে এপিসিআইসিটির প্রশাসনিক ও আর্থিক পরিস্থিতি, পূর্ববর্তী অধিবেশনের পরবর্তী কার্যক্রম এবং ২০২৭ সালের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। গৃহীত পরিকল্পনায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কারিগরি সহযোগিতা এবং জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি সংস্থার সক্ষমতা ও সুশাসন বৃদ্ধি এবং সদস্য দেশগুলোর প্রকৃত চাহিদার সাথে এপিসিআইসিটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সমন্বয় করার বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়।
মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন জানান, এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি এটি একটি বড় আঞ্চলিক দায়িত্ব। সদস্য দেশগুলোর চাহিদার আলোকে জ্ঞান বিনিময় ও কারিগরি সহযোগিতাকে ফলপ্রসূ করাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। জনসেবায় উদ্ভাবন, ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সক্ষমতা তৈরিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশের সাথে ভাগ করে নিতে তারা আগ্রহী।
ব্যাংককে ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আয়োজিত এসক্যাপের বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের সভায় মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১ সেপ্টেম্বর এশিয়া-প্যাসিফিক ইনফরমেশন সুপারহাইওয়ে (এপিআইএস) পরিচালনা কমিটির দশম অধিবেশন এবং ২ সেপ্টেম্বর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন সংক্রান্ত এসক্যাপ কমিটির পঞ্চম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর এপিসিআইসিটি গভর্নিং কাউন্সিলের ২১তম অধিবেশন সম্পন্ন হয়।
উক্ত সভাগুলোতে এপিআইএস কর্মপরিকল্পনা ২০২৭-২০৩০ বাস্তবায়নের বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়। ১৫টি কার্যক্রম সম্বলিত এই পরিকল্পনার তিনটি মূল ভিত্তি হলো—সবার জন্য সংযোগ, উদীয়মান প্রযুক্তি ও স্মার্ট জনসেবা এবং ডিজিটাল উপাত্ত। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গঠিত ডিজিটাল উপাত্ত বিষয়ক তৃতীয় কার্যদলের ভাইস চেয়ার হিসেবেও বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করছে। এর ফলে উপাত্তের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, আন্তঃদেশীয় জ্ঞান আদান-প্রদান এবং ডেটানির্ভর জনসেবা উন্নয়নে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এপিসিআইসিটির সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ‘উইমেন আইসিটি ফ্রন্টিয়ার ইনিশিয়েটিভ’। নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কাজে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সহায়তায় এবং বিভিন্ন অংশীদারের অংশগ্রহণে এই কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আধুনিক সংস্করণ ‘ডব্লিউআইএফআই ডিএক্স’-এর মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, আর্থিক সাক্ষরতা, ডেটা অ্যানালাইসিস, অনলাইন নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এপিসিআইসিটি গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ এই ধরনের প্রকল্পগুলোতে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার নতুন সুযোগ পাবে।
এপিসিআইসিটি হলো এসক্যাপের পাঁচটি আঞ্চলিক সংস্থার একটি। এটি প্রশিক্ষণ, জ্ঞান আদান-প্রদান, বহুপাক্ষিক আলোচনা ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর আর্থসামাজিক অগ্রগতিতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে থাকে।
জাতিসংঘের এপিসিআইসিটি গভর্নিং কাউন্সিলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ



Leave a Reply